আজ ১৩ নভেম্বর বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তী লেখক, তুমুল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৭৭ তম জন্মদিন। হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে তার মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্য জগতে এক অপার বিস্ময়ের নাম হুমায়ূন আহমেদ। তার রচিত আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় যে ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের ডাকনাম ছিল কাজল। তার পিতা (ফয়জুর রহমান) নিজের নামের সাথে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীতে আবার তিনি নিজেই ছেলের নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন।
আশির দশক থেকে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তাকে কেউ টপকাতে পারেননি। আজও তা অক্ষুন্ন রয়েছে। তার সমসাময়িক এবং অগ্রজ, অনুজ বহু লেখক আছেন কিন্তু হুমায়ুন আহমেদের ধারে-কাছেও যেতে পারেননি জনপ্রিয়তায়। ঠিক সেই কারণেই একজন হুমায়ূন আহমেদের প্রচন্ড অভাববোধ করে বাংলা সাহিত্য এবং আগামী কত বছরে সেই খরা কাটবে তা বলা যায় না। যেমন কবিতায় জীবনানন্দ দাস যে মুক্তি দিয়েছিল তা রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে এবং বহু বছর পর। পাঠকের সাথে লেখকের সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তার লেখনীর মাধ্যমে। তার বিকল্প কেউ আজও সাহিত্য নিয়ে হাজির হন নি। কেউ হিমু বা মিসির আলীর ধারে কাছেও একটি চরিত্র সৃষ্টি করতে পারেননি। এটা লেখকদের ব্যর্থতা বলা যায়। বেঁচে থাকতে হুমায়ূন আহমেদের সামনে পেছনে নামী দামী প্রকাশকদের ভিড় থাকতো, একটা বই পাওয়ার আশায়। একথা স্বীকার করছি এই বিপুল লেখা লিখতে গিয়ে লেখার চাপে অনেক লেখাই হালকা হয়েছে, এবং সাহিত্যের মানদন্ডে তা ভারী নয় কিন্তু এই চাপটা তাকে নিতে হয়েছে কারণ বাজারে তার বইয়ের আকাশ সমান চাহিদা। পাঠকের বিপুল চাপ। আজ কি পাঠকের চাপ রয়েছে?
তিনি সহিত্যের ভূবনে ছিলেন স¤্রাট। তার পাঠক শ্রেণি ছিল আলাদা। যারা গোগ্রাসে তার লেখা পড়তো। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রা অসাধারণ দক্ষতায় তুলে এনেছেন। অবশ্য তার সমালোচক শ্রেণিরও অভাব ছিল না। সমালোচনা তার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনি তার লেখার ধরন নিজের মতো ঠিখ রেখেছেন। সে সমালোচনা তাকে আরও উঁচুতে পৌছে দিয়েছে। হুমায়ুন আহমেদের লজিক ও আ্যান্টিলজিক চরিত্র হিমু ও মিসির আলী চরিত্র দুটি আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয়। এ চরিত্র নিয়েই দেশে বহু আলোচনা হয়েছে। বাস্তবতার সাথে মেলানোর প্রচেষ্টাও করা হয়েছে। অনেক সময় চরিত্র দুটির ¯্রষ্টাকেই এই চরিত্রের সত্যিকারের মানুষ বলে মনে হয়েছে। কোন কোন লেখকের বই পাঠক গোগ্রাসে গিলে আবার কোন কোন বই পাঠক গোগ্রাসে না গিললেও তার গভীরতা পাঠককুলকে আকৃষ্ট করে। হুমায়ুন আহমেদ বাংলাদেশে যে এক তুমুল জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক ছিলেন সে কথা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়। কোনো একটি বই পড়তে গিয়ে অর্ধেক পড়ার পর যদি বিরক্তির জন্ম হয় তখন বুঝতে হবে লেখায় পাঠককে টানার ক্ষমতা কম ছিল। একটি বইয়ের যত গভীরে যাওয়া যাবে তত বইটি শেষ করার ইচ্ছা জাগতে হবে। উপন্যাস বা ছোট গল্পের চরিত্রের সাথে নিজেকে কল্পনা করেও অনেক পাঠক তৃপ্তি বোধ করেন। যেমন কেউ হুমায়ুন আহমেদের হিমু সেজে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। ঠিক এসব কারণেই দশ বছর কেন যুগের পর যুগেও হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে প্রাসঙ্গিক। এখন যে ধারায় সাহিত্য চর্চা চলছে সেখানে নতুন লেখক আসলেও লেখক হিসেবে নিজেকে পাঠকের কাছে বা কত সংখ্যক পাঠকের কাছে নিজেকে স্থায়ী করতে পারছেন সেটাও প্রশ্ন। কোনো উল্লেখযোগ্য আলোচিত চরিত্রও আমরা পাইনি বা পাচ্ছি না। বহুমুখী প্রতিভার হুমায়ূন আহমেদ যে বাংলা সাহিত্যে অমর সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।